Sheep

ভেড়া অত্যন্ত কষ্টসহিষ্ণু। এছাড়া প্রতিকূল পরিবেশে শুকনো খড় এবং শস্যের অবশিষ্ট খেয়েও জীবনধারণ করতে পারে। খামার পরিচালনায় খাদ্য খরচ অনেক কম।

একটি প্রাপ্তবয়স্ক ভেড়ার ওজন ১৫ থেকে ২০ কেজি হতে পারে। প্রতিটি ভেড়া থেকে বছরে গড়ে এক থেকে দেড় কেজি পশম পাওয়া যায়। যা দিয়ে উন্নত মানের শীতবস্ত্র হয়। ভেড়া উৎপাদন বাড়ার হার শতকরা ১২ ভাগ। যা গরু, ছাগল ও মহিষের চেয়ে অনেক বেশি। এদের বাসস্থানের খরচও কম। নরম, রসাল ও সুস্বাদু ভেড়ার মাংসে আমিষের পরিমাণ গরু ও ছাগলসহ অন্যদের চেয়ে বেশি। ভেড়ার মাংসে জিঙ্ক, আয়রন এবং ভিটামিনের পরিমাণ বেশি এবং চর্বি ও কোলস্টেরল কম।

ভেড়া দলবদ্ধভাবে থাকতে পছন্দ করে। এ কারণে গরুর সঙ্গে অতিরিক্ত জনবল ছাড়াই ভেড়া পালন সম্ভব। ভেড়া পালনের বড় সুবিধাটি হলো, গরুর সঙ্গে একই খামারে বা ঘরে ছাগল পালন করা যায় না কিন্তু অতি সামান্য খরচ ও সহজ পরিচর্যায় ভেড়া পালন করা যায়। চর এলাকার বাথানে, উপকূলে এবং হাওরাঞ্চলের চারণভূমিতে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত কাঁচা ঘাস খাইয়ে অল্প খরচে বৎসরের শুকনো মৌসুমসহ প্রায় সব সময়ই ভেড়া পালন করা সম্ভব।

বিদেশে ভেড়ার মাংস ও পশমের চাহিদা অনেক বেশি। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানিরও সুযোগ রয়েছে।

অল্প পুঁজি স্বল্প জায়গায় অধিক লাভ

ভেড়া সাধারণত দলবেঁধে চড়ে বেড়ায়। রাতে খোঁয়াড়ে আসে। এরা সারা দিন বাড়ির আশপাশে, মাঠ-ঘাটে চড়ে নিকৃষ্ট জাতের ঘাস, খড়কুটো, জমির ফসল কাটার পর পরিত্যক্ত খড়, আগাছা খেয়ে জীবনধারণ করতে পারে, যা অন্য কোনো প্রাণী দিয়ে সম্ভব হয় না।

ভেড়ার জন্য গরু-মহিষের মতো তত বড় চারণভূমির প্রয়োজন হয় না। গরু-মহিষের মতো বিপুল খাদ্যের প্রয়োজন হয় না। বাড়ির আশপাশের বা ক্ষেতের আইলের বা পুকুরপাড়ের নিকৃষ্ট ঘাস, গাছ-গাছড়ার পাতা, লতা-গুল্ম দিয়ে এদের খাদ্যের প্রয়োজন মেটাতে পারে। তাই কৃষিজমির ওপর চাপ সৃষ্টি না করে অল্প জায়গাতেই প্রতিটি পরিবারে কয়েকটি ভেড়া পালন করে আমাদের প্রাণিজ আমিষের প্রয়োজন মেটানো যায়।

গরু-মহিষের তুলনায় ছাগল পালনের মতোই ভেড়া পালনে বহুবিধ সুবিধা রয়েছে। ভেড়া পালনে গরু-মহিষের মতো মোটা অঙ্কের মূলধন বা পুঁজি বিনিয়োগ করতে হয় না। অল্প পুঁজিতে অল্প জায়গায় কয়েকটি ভেড়া পালন করে অল্প সময়ে অধিক লাভবান হওয়া যায়। ভূমিহীন, প্রান্তিক চাষি, বেকার যুবক, দুস্থ মহিলা এমনকি স্কুলের ছাত্রছাত্রী যারা বেশি পুঁজি জোগাড় করতে পারে না, তারা ভেড়া পালন করে দ্রুত আয়ের পথ করে নিতে পারে। আমাদের দেশে চারণভূমির যে সমস্যা, তাতে ভেড়া পালনের প্রতি বেশি নজর দিতে হবে।

অধিক লাভজনক গাড়ল প্রজাতির ভেড়া

ভারতীয় জাতের ‘গাড়ল’ ভেড়া পালন খুবই লাভজনক। এতে খরচ কম অথচ লাভ বেশি। স্বাদ ও পুষ্টিগুণ বেশি হওয়ায় এর মাংসের চাহিদা ব্যাপক। বাণিজ্যিকভাবে দেশে বেশি গাড়লের খামার হলে মাংসের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের দেশি ভেড়া যাকে বলে ওই ভেড়া আর গাড়ল দেখতে প্রায় একই রকমের। তবে ভেড়ার লেজ ছোট, ছাগলের লেজের মতো; আর গাড়লের লেজ লম্বা হয় গরুর লেজের মতো।

গাড়লকে আবার অনেকে কাশ্মীরি ভেড়া বলেও ডাকে। গাড়ল ২-৩ জাতের আছে। পিওর গাড়ল, ভেড়া আর গাড়লের ক্রস এবং ক্রস গাড়লের ক্রস ইত্যাদি। পিওর গাড়লের লেজ প্রায় মাটিতে লেগে থাকে এবং আকারে বড় হয়। বাংলাদেশের কুষ্টিয়া, মেহেরপুরসহ কিছু জায়গায় গাড়ল বেশি পাওয়া যায়। তাছাড়া বাণিজ্যিকভাবে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছোট-বড় কিছু কিছু গাড়লের খামার গড়ে উঠছে।

ভেড়া পালন সংশ্লিষ্ট তথ্য

– পৃথিবীতে প্রায় ২০০-এর বেশি ভেড়ার জাত রয়েছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) কর্তৃক কয়েক শ ভেড়ার জাত শনাক্ত করা হয়েছে।

– ভেড়ার মাংসের পুষ্টিমান এবং স্বাদ ছাগলের মাংসের প্রায় অনুরূপ। অনেকের বিরূপ ধারণা থাকলেও ভেড়ার মাংসে বিরক্তিকর গন্ধও নেই।

– প্রাপ্তবয়স্ক একটি ভেড়ার ওজন ১৫ থেকে ২০ কেজি হতে পারে। একটি ভেড়া থেকে বছরে গড়ে এক থেকে দেড় কেজি পশম পাওয়া যায়। ভেড়ার পশম দিয়ে উন্নত মানের শীতবস্ত্র হয়। ভেড়া পালনে বাসস্থানের ব্যয়ও কম। রোগব্যাধি

– ভারতের উত্তরাঞ্চলে ভেড়ার বহু খামার রয়েছে। অনেকের আয়ের উৎস এই ভেড়া। বাংলাদেশেও ভেড়ার উৎপাদন বাড়ানোর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

– ভেড়ার মলমূত্রে গোবরের চেয়ে দ্বিগুণ বেশি নাইট্রোজেন ও পটাসিয়াম থাকে।

– ভেড়া থেকে একই সঙ্গে মাংস, দুধ ও পশম পাওয়া যায়।

– ভেড়া তার নরম মুখ দিয়ে অতি ছোট ছোট ঘাস-লতাপাতা খেয়ে কৃষিজমির আগাছা কমাতে পারে।

– আঞ্চলিক আবহাওয়া, পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং স্বল্প খরচে ও সহজপ্রাপ্য খাদ্যসামগ্রীর ওপর ভেড়া পালন নির্ভরশীল।

– সম্পূর্ণ ছেড়ে খাওয়ানো, সম্পূর্ণ আবদ্ধ অথবা মিশ্র পদ্ধতিতে ভেড়া পালন করা যেতে পারে।

– চারণ-ভূমিভিত্তিক এবং ভূমিহীন উৎপাদন ব্যবস্থায় ভেড়া পালন করা হয়।

– বাংলাদেশে আধা-নিবিড় সাবসিস্টেন্স পদ্ধতি, সম্পূর্ণ ছেড়ে পালন, ক্ষুদ্র খামার পদ্ধতি এবং বরেন্দ্র এলাকার আধা-নিবিড় বাণিজ্যিক পদ্ধতিতে ভেড়া পালন করা যায়।

– বাংলাদেশের রাজশাহী, নাটোর, বগুড়া, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং পাবনা জেলায় ছেড়ে-রাখা পদ্ধতিতে ভেড়া পালন করা হয়।

– বাংলাদেশের আবহাওয়া-উপযোগী নতুন জাত সৃষ্টির জন্য রাজশাহী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোনো কোনো খামারি ভারতের ছোট নাগপুরী জাতের ভেড়ার সঙ্গে দেশি ভেড়ার শংকরায়ণ করে ভেড়া পালন করেন।