Cattle Food

সাইলেজ হ’ল সবুজ পাতাযুক্ত ফসলের থেকে তৈরি এক ধরণের খাদ্য যা পশুর জন্য খাদ্য হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়, গাঁজনার মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়। এটি গবাদি পশু, ভেড়া, ছাগল এবং এই জাতীয় পশুদের খাওয়ানো যেতে পারে। গাঁজন এবং স্টোরেজ প্রক্রিয়াটিকে ইজিলিজ বলা হয়, ইন্‌সিলাইজিং বা সিলেজিং করা হয় এবং সাধারণত ভুট্টা, জর্বা বা অন্যান্য ঘাসের ফসল থেকে তৈরি করা হয়, পুরো সবুজ উদ্ভিদ (কেবল দানা নয়) ব্যবহার করে। অনেক জমির ফসল থেকে সিলেজ তৈরি করা যেতে পারে এবং প্রকারের উপর নির্ভর করে বিশেষ পদ ব্যবহার করা যেতে পারে। ওটসের জন্য ওটলেজ, আলফালার জন্য খড় ইত্যাদি।

গরুর স্বাস্থ্যের জন্য উত্তম খাবার হচ্ছে উন্নত নেপিয়ার ঘাস। এ নেপিয়ার পাক চং-১ জাতের ঘাস গরুর খাবারের ৬টি উপাদানের সুষম চাহিদা পূরণ করে। অন্যান্য দানাদার খাবার গরুকে বেশি খাওয়ালে তাতে সব খাদ্য গুণ পাওয়া যায় না। এ ছাড়া খাদ্য হিসাবে কেবল ঘাস দিলে গরুর পরিপাক ব্যবস্থা ভালো থাকে। গরুর পুরো পাচক প্রক্রিয়া ঘাসের জন্যই মূলত তৈরি।

জাতের ঘাস রোপনের ৩ মাসের মাথায় কাটার উপযোগী হয়ে যায়। দ্বিতীয় পর্যায়ে একই গোছা (গোড়া) থেকে চারা গজায়। সে ক্ষেত্রে ৪৫ দিনের মধ্যে কাটার উপযোগী হয়। একটি গোছা থেকে ১২-১৫ কেজি ঘাস পাওয়া যায়। প্রতিদিন ১৫-১৬ কেজি ঘাস প্রয়োজন হয় একটি প্রাপ্ত বয়স্ক গরুর। একবার রোপন করলে ৪ বছর ধরে অনবরত ঘাস পাওয়া যায় ওই ক্ষেতে।

যে খাবার ছয় প্রকার খাদ্য উপাদান পরিমিত পরিমাণে সরবরাহ করে তাকে সুষম খাবার বলা হয়। শ্বেতসার বা শর্করা, আমিষ বা  প্রোটিন, চর্বি বা তেল, খাদ্যপ্রাণ বা ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি হলো আবশ্যকীয় খাদ্য উপাদান।
 

সুষম খাদ্য-
০ শরীরে শক্তি ও কাজ করার ক্ষমতা দেয়;
০ শরীরের বৃদ্ধি ও ক্ষয়পূরণ করে;
০ শরীরকে রোগমুক্ত রাখাতে সাহায্য করে।
গবাদিপশুর খাদ্য প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত ১. ছোবড়া বা আঁশজাতীয় খাদ্য। ২. দানাদার খাদ্য।
 

ছোবড়া বা আঁশওয়ালা খাদ্য
এ প্রকার গোখাদ্যে আয়তনের তুলনায় পুষ্টি উপাদন তুলনামূলক কম থাকে। এটি প্রধানত শ্বেতসার বা শর্করা জাতীয় খাদ্য উপাদান সরবরাহ করে। এর পাচ্যতা কম তবে জাবর কাটা প্রাণীদের জীবনধারণ, বৃদ্ধি ও উৎপাদনের জন্য এ খাদ্যর পরিমিত সরবরাহ প্রয়োজন। ছোবড়াজাতীয় গোখাদ্যগুলো হলো লিগুম বা শিমজাতীয় কচি ঘাসের খড়, নাড়া, খড় বা বিচালি, গোচারণ ঘাস এবং রক্ষত ঘাস।
 

দানাদার খাদ্য
যেসব খাদ্যে আয়তনের তুলনায় খাদ্যমান অপেক্ষাকৃত বেশি এবং সহজপাচ্য তাকে দানাদার খাদ্য বলা হয়। দানাদার গোখাদ্যগুলো হলো চালের কুঁড়া গমের ভুসি, ভুট্টা, বিভিন্ন প্রকার খৈল, কলাই, ছোলা, খেসারি, সয়াবিন ও শুকনো মাছের গুঁড়া এসব। আমিষের পরিমাণ ভিত্তিতে দানাদার খাদ্যগুলো তিন ভাগে করা যায়। ক. কম আমিষ সমৃদ্ধ খাদ্য যেমন- কুঁড়া, ভুসি (৫-১৫% আমিষ)। খ. মধ্যম আমিষসমৃদ্ধ খাদ্য যেমন- খৈল, কলাই, ছোলা ২০-২৫% আমিষ। গ. উচ্চ আমিষ সমৃদ্ধ খাদ্য শুকনো মাছের গুঁড়া, কসাই খানার মাংসের কণা, রক্তের গুঁড়া ৩৫-৪৫% আমিষ।
 

বাছুরের খাদ্য
বাছুর প্রসবের পরেই বাছুরকে তার মায়ের প্রথম দুধ অর্থাৎ কাচলা দুধ খাওয়াতে হবে। কারণ এতে প্রচুর পরিমাণ রোগ প্রতিরোধক উপাদান রয়েছে। বাছুরের প্রধান খাদ্য দুধ কারণ জন্মের পর পর প্রথম সপ্তাহে বাছুর দুধ ছাড়া কিছুই খেতে পারে না। বাছুরের ওজনের প্রতি ১০ কেজির জন্য ১ কেজি দুধ প্রতিদিন খেতে দিতে হবে। গরুর বাচ্চা ৩০ কেজির ওপর ওজন হলেও ৩ কেজি দুধ সরবরাহ করতে হবে। দুই সপ্তাহ থেকে বাছুরকে সামান্য কিছু ঘাস ও দানাদার খাবার দেয়া যেতে পারে। বাছুরের বয়স ৭-৮ মাস হওয়ার পরে যথেষ্ট পরিমাণে আমিষ জাতীয় দানাদার খাদ্য দিতে হবে। প্রথমত, ছোবড়াজাতীয় খাদ্য না দিয়ে সহজপাচ্য সবুজ ঘাস দিতে হবে। বাছুরের শারীরিক বৃদ্ধি প্রধানত পরিপাকযোগ্য আমিষ সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। বয়স বাড়ার সাথে খাদ্যের পরিমাণও বাড়বে।
 

দুধালো গাভীর খাদ্য
সাধারণত দুধালো গাভীর প্রতি ১০০ কেজির জন্য ২ কেজি খড় সরবরাহ করতে হয়। ১ কেজি খড় ৩ কেজি তাজা সবুজ ঘাসের সমতুল্য। গাভীকে প্রতি ১০০ কেজি ওজনের জন্য ১ কেজি শুকনো আঁশযুক্ত খাদ্য (খড়) এবং ৩ কেজি তাজা সবুজ আঁশযুক্ত খাদ্য ঘাস দেয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ ৫০০ কেজি ওজনের একটি দুগ্ধবতী গাভীকে ৫ কেজি শুকনো খড় এবং ১৫ কেজি সবুজ ঘাস সরবরাহ করতে হবে। দানাদার খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা দুধ উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। দুধ উৎপাদনের প্রথম ৩ কেজির জন্য প্রয়োজন ৩  কেজি মিশ্র দানাদার খাদ্য এবং পরবর্তী প্রতি ৩ কেজির জন্য প্রয়োজন ১ কেজি মিশ্র দানাদার খাদ্য। অবশ্য যদি দুধে স্নেহ পদার্থের পরিমাণ শতকরা ৪ ভাগ বা তার নিচে থাকে। দুধে স্নেহ পদার্থের পরিমাণ শতকরা ৪ ভাগের বেশি হলে প্রতি ৩ কেজি দুধের পরিবর্তে প্রতি আড়াই কেজি দুধের জন্য ১ কেজি মিশ্র দানাদার খাদ্যের প্রয়োজন হয়। এ হিসাবে দেশি ও সংকর জাতের গাভীকে সর্বোচ্চ ৬ কেজি এবং বিশুদ্ধ বিদেশি গাভীকে সর্বোচ্চ ৮ কেজি মিশ্র দানাদার খাদ্য সরবরাহ করতে হয়।


লবণের চাহিদা পূরণের জন্য গাভীকে মাথাপিছু প্রতিদিন ৬০ গ্রাম খাওয়ার লবণ এবং ৬০ গ্রাম জীবাণুমুক্ত হাড়ের গুঁড়া খাওয়াতে হবে। খাবারে সরবরাহকৃত সবুজ ঘাস গাভীর ‘এ’ ভিটামিনের চাহিদা মেটাতে পারে। ‘বি’ ভিটামিন গবাদিপশু স্বয়ং প্রক্রিয়ার প্রস্তুত করতে পারে। গাভীকে প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে হবে। গবাদিপশুকে যেসব কাঁচা ঘাস খাওয়ানো হয় তার মধ্যে  নেপিয়ার ও পারা ঘাস অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ও উপকারী ঘাসের উৎপাদন পদ্ধতি।

পারা ঘাস
পারা উন্নতমানের ঘাস এবং এর চাষ করাও সহজ। দেশের অধিকাংশ কৃষক উন্নত জাতের ঘাস সম্পর্কে অবগত নন। এ ঘাসের চাষ পদ্ধতি ও গুণাগুণ সম্পর্কে তারা অবগত হলে আরও উৎসাহিত হবেন। পারা ঘাস দক্ষিণ আমেরিকার ঘাস কিন্তু বর্তমানে দেশের সর্বত্রই এর চাষ হয়ে থাকে। পারা একটি স্থায়ী জাতের অর্থাৎ একবার চাষ করলে কয়েক বছর ধরে ফসল পাওয়া যায়। জলীয় ও আর্দ্র অঞ্চলে এ ঘাস ভালো হয় তাই আমাদের দেশের আবহাওয়ায় এটি খুবই উপযোগী। এ ঘাস দেখতে লতার মতো, কাণ্ড গোলাকৃতি ও সবুজ বর্ণের। সারা গায়ে প্রচুর সূক্ষ্ম লোম আছে।


উঁচু নিচু সব মাটি-জমিতেই জন্মে। এমনকি আবদ্ধ পানি ও লোনা মাটিতেও এ ঘাস জন্মানো সম্ভব। বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলের জন্য এ ঘাস চাষ খুবই সম্ভাবনাপূর্ণ। আম কাঁঠালের বাগানের ফাঁকে ফাঁকে, রাস্তার দুই পাশে সেঁতসেঁত জায়গায়, জলাবদ্ধ স্থানে, এমনকি সমুদ্র উপকূলবর্তী জেলাগুলোর লবণাক্ত জমিতে যেখানে সাধারণত অন্য ফসলের চাষ হয় না, সেসব জমিতেও পারা ঘাস স্বার্থকভাবে চাষ করা যায। অবশ্য শীতকালে অধিক ঠাণ্ডায় এ ঘাসের উৎপাদন কমে যায়।